বন, পাহাড়, নদী আর ড্রাগনের গল্প (ভুটান ভ্রমণ পর্ব ১)

অনেকদিন ধরেই আমাদের দুজনের খুব ইচ্ছা ছিল ভূটান যাওয়ার, ২০১৫ এর জানুয়ারিতে যখন আমি চাকরিটা বদলে নতুন অফিসে জয়েন করি, তখন প্লান করেছিলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম ওই সময় ভুটানে অনেক তুষারপাত হয়, নেপালের ঠাণ্ডার অভিজ্ঞতায় সিদ্ধান্ত নেই পরে যাবার। অবশেষে যেতে পেরেছিলাম ২০১৫ এর শেষে নভেম্বরে।

ভুটানের একমাত্র এয়ারপোর্ট পারো শহরে। পুরো দেশটাই পাহাড়ী, তাই তাদের এয়ারপোর্টটাও আলাদা, বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজনক এয়ারপোর্টের একটি । সব পাইলট ল্যান্ড করতে পারেন না, বাংলাদেশ থেকে একমাত্র Drukair এই যাওয়া যায়। একটু ভয় ও লাগছিল, তবে যখন ১.৫ ঘণ্টা ফ্লাইট শেষে পৌঁছলাম, পাহাড় ঘেরা এয়ারপোর্টের চারপাশটা দেখেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম । বিমান থেকে আগে দূরে পাহাড় দেখেছি, আর এবার দেখলাম দূরে হিমালয় আর বিমান অবতরনের সময় ২ পাশে পাহাড় । পাহাড়ের মাঝে দিয়ে এঁকেবেঁকে যখন বিমানটা ল্যান্ড করল, সত্যিই অসাধারণ !এয়ারপোর্টটা খুব ছোট, তবে বেশ ছিমছাম। on arrival visa নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি আমরা বের হলাম। বাংলাদেশীদের ভুটান গেলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে বাধ্যতামুলক গাইড (বাংলাদেশী, ভারতীয় বাদে অধিকাংশদের নিতে হয়) নিতে হয় না, এজন্য অনেক খরচ বেঁচে যায়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই বেশ এক টা হিমেল হাওয়ার ধাক্কা খেলাম। তাপমাত্রা তখন ছিল ১০ ডিগ্রির কাছাকাছি। আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে চেন চো নামের একজনের ট্যাক্সি নেই, চমতকার এই ভদ্রলোকের সাথেই আমরা বাকি সময় টা কাটিয়েছি। ভুটানের ব্যপারে যে ভাল লাগা টা মনের মধ্যে স্থায়ী হয়ে আছে , তাতে ওনার আর ওনার স্ত্রীর ( উনিও জয়েন করেছিলেন) অবদান আছে। এই ভদ্রমহিলার আন্তরিকতা ভীষণ মুগ্ধ করেছিল আমাদের। পুরা ট্রিপে বিভিন্ন দরকারি টিপস দিয়ে, কখনো ওদের ইতিহাস বর্ণনা করে, culture বুঝিয়ে, TREK এ যাবার লাঠি দিয়ে, আরও কত কি দিয়ে সাহায্য করেছেন। এমন কি এমা দাতসে (ভুটানি পনির আর লাল মরিচের তরকারি) আমার ভাল লেগেছে শুনে ফেরার দিন অনেক গুল লাল মরিচ দিয়ে দিয়েছিল যাতে বাসায় এসে রান্না করতে পারি!

আমরা এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি থিম্পুতে যাই দেড় ঘণ্টা ড্রাইভ শেষে। এত শান্ত চারপাশটা, ঢাকার কোলাহল থেকে গিয়ে হঠাৎ অদ্ভুত লাগে। নদী, বন, পাহাড় আর পর্বত এর এই দেশ শহুরে কাঠখট্টা ভাবটা বলতে গেলে নেই। রাস্তার পাশে ছোট ছোট ওই দেশীয় কায়দায় তৈরি একতলা, দুতলা সাদা সাদা বাড়ি, একদম ছোটবেলার বইয়ের বর্ণনার মতই সুন্দর। কোথাও রাস্তার পাশে একদম খাঁড়া পাথুরে পাহাড়, আবার কোথাও গাছ ওয়ালা সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে একেবেকে গাড়ি চলছিল। পথে পারো ছু (নদী)এর দেখা পেলাম,নদীর উপরে লোহার ব্রিজ, মানুষজন চোখে পড়েছে খুব কম।

থিম্পু শহরটা খুব পরিষ্কার আর নিরিবিলি। বড় কোন শপিং মল বা হাই রাইজ কোন বিল্ডিং নেই, কিন্তু প্রকৃতিগত ভাবেই শহরটা ছবির মত সাজানো। মনে হচ্ছিল পাহাড়ের গায়ে থরে থরে সযত্নে সাজানো যাতে পাহাড়ের সৌন্দর্যের একটুও কমতি না হয়। ওখানে আমরা হোটেল শান্তিদেভাতে ছিলাম ২৪০০ টাকাতে, Clock Tower Square এর অপর পাশে। ওই রাস্তায় বিভিন্ন দামের আর অনেক হোটেল আছে। ভুটান ঠাণ্ডার দেশ তাই রুম এ রুম হিটার টা থাকা খুব দরকার। মোটামুটি ১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে আরও বেশি দামে ভাল হোটেল পাওয়া যায়। আর আমাদের ৬ দিনের ট্রিপে ১৮৫০০ টাকা দিয়েছিলাম ট্যাক্সি ড্রাইভার কে। উনি ই আমাদের ট্যাক্সি নিয়ে থিম্পু, পারো, হা আর পুনাখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন । ২ জন মিলে খরচ হয়েছিল ৯০,০০০ টাকা।

ভুটান আমাদের খুব কাছের দেশ হলেও সংস্কৃতির দিক থেকে একেবারেই আলাদা। মানুষ গুল দেখতে অনেক টাই তিব্বতি বা চিনাদের মত, আমাদের মত সবসময় হইচই করার স্বভাব নেই, বরং অনে্ক বেশি বিনয়ী। ঠাণ্ডার দেশ, তাই অধিকাংশ মানুষ আমরা বাংলাদেশি শোনার পর চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করেছে, অনেক গরম, তাই না? ভুটানের আরে একটা মজার ব্যপার হচ্ছে স্কুল, অফিস, মন্দিরে ট্র্যাডিশনাল পোশাক বাধ্যতামুলক। এই ব্যপারটা দেশ টা কে অনেক বেশি রঙিন করেছে। মাত্র লাখ সাতেক মানুষের দেশ ভূটান। তাই পুরা দেশ টাই নিরিবিলি, এক শহর থেকে আরেক শহরে যাবার পথে রাস্তা থেকে দুরের গ্রামগুলকে দেখে ঠিক ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় মনে হয়েছে। মানুষ গুল অধিকাংশই বেশ ধার্মিক, সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বি। ভুটানিদের ভাষা নাম জংখা, খুব খেয়াল করে শুনলেও এক বিন্দু ও বুঝা যায় না। ওরা আমাদের মত ভাত খেলেও খাবারের স্বাদ অনেক টাই আলাদা। আমাদের মত মসলাদার রান্না না, বরং অনেক টাই সুপের মত পানি পানি রান্না। প্রচুর লাল মরিচ আর পনির দিয়ে রান্না করে। থুকপা নামের এক টা ওই দেশীয় নুডলস বেশ পাওয়া যায়। এই ধাচের খাবারের সাথে আমাদের মানিয়ে নেয়া টা একটু কঠিন। তবে ওখানে বেশ ভাল পুরি, আলু পারাটা ধরনের খাবার বানায়। আর লোকাল খাবারের মধ্যে এমা (মরিচ) দাতসে (চিজ) বা কেওয়া (আলু) দাতসে আমাদের খুব ভাল লেগেছে।

ওদের কারেন্সির নাম গুলত্রাম, ইন্ডিয়ান রুপির সমান মূল্য। জিনিস পত্রের দাম আমাদের দেশের চেয়ে কম না। অধিকাংশ জিনিস ইমপোর্ট করতে হয়, তাই দামটা একটু বেশি । তাই শপিংয়ের জন্য ভুটান তেমন ভাল লাগে নি। সুভেনিয়র এর জন্য আমরা বাসায় ভুটানি চিজ নিয়ে এসে ছিলাম। শাল পাওয়া যায়, তবে নেপাল থেকে আনা তাই দাম বেশি পরে যায় বলে কিনি নি। থিম্পুতে আমরা hadicraft market এ গিয়েছিলাম । ওখানে সুভেনিয়র পাওয়া যায়।

থিম্পুতে আমরা Memorial Chorten Stupa (শহরের মাঝে বুদ্ধ্য মন্দির), Buddha Poin আর Takin Zoo তে গিয়েছিলাম। Buddha Point থিম্পুর একদম পাহারের মাথায়, অখান থেকে পুরা থিম্পু শহর দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে ঘরবাড়ি, সর্পিল রাস্তা আর সুনসান পাইন ফরেস্টের নিরবতা। ফেরার পথে আমরা Tashiccho Dzong (parliament আর রাজবাড়ি) দেখলাম, ট্র্যাডিশনাল বিল্ডিং,কোন বাড়াবাড়ি নেই। এই দেশের মানুষ তাদের লামা( ধর্মগুরু) আর রাজাকে খুব শ্রদ্ধা করে। বেশ আগ্রহ নিয়ে রাজার ভাল ভাল পদক্ষেপ আর অনাড়ম্বর জীবনের গল্প করে, আমাদের কানে আসলে বেশ অদ্ভুত লাগে ব্যপার গুল। Takin Zoo এর মুল আকর্ষণ Takin (ভুটানের জাতীয় প্রানী), প্রাকৃতিক পরিবেশটা বেশ ভালো লেগেছে, তবে ওখানে বেশি ভাল লেগেছে পাহাড়ে হেটে বেড়াতে। কারন Zoo টা আসলে এক টা পাহাড়ের অংশ, পশুগুল ও বেশ খোলামেলা পরিবেশে থাকে। পানির শব্দ খেয়াল করে সুন্দর একটা ঝরনা পেয়ে গেলাম। অথচ কেউ বলেই নি এত সুন্দর ঝরনা টার কথা!

থিম্পু থেকে আমরা ইমিগ্রাশন অফিসের অনুমতি নেই (পারো আর থিম্পুর বাইরে যেতে অনুমতি লাগে) হা এবং পুনাখা যাবার। ঘন বন, পাহাড় আবার কখনো অনেক দুরের গ্রাম দেখে দেখে বিকেল ৪ টায় আমরা পৌঁছাই পুনাখা তে। মাঝে Dochu La তে বিরতি নেই। Dochu La pass রাস্তা টা মুলত ত্থিম্পু থেকে পুনাখা যাবার রাস্তা যেখান থেকে হিমালয়ান রেঞ্জ দেখা যায়। রাস্তার পাশে Druk Wangyal Chortens (১০৮ টি স্তুপার চমৎকার একটি মন্দির) আর অপর পাশে তাকালে নীল ঝলমলে আকাশে উকি দিচ্ছে তুষারে ঢাকা পর্বতের রেঞ্জ। Jomolhari peak টা সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। পুনাখা ছোট্ট একটা শহর। খাবার দোকান, হোটেল হাতে গোনা কয়েকটা। সন্ধ্যার পর বলতে গেলে কিছুই করারে নেই। তবে এজন্যই প্রকৃতির উদারতাটা খুব চমৎকার উপলব্ধি করা যায়। ভুটানিদের সব বড় শহরগুলতে জং(দুর্গ) ache , চমতকার ভাবে এখনও সংরক্ষন করে যাচ্ছে। সরকারি কাজ কর্ম হয় আবার মংকরাও থাকেন। পুনাখা জং টা সবচেয়ে বড় ছিল অন্যগুলর চেয়ে আর সুন্দর ও লেগেছে আমাদের কাছে। পুনাখা নদীর পাড়ে জং, মংকরা, বিভিন্ন দেশী পর্যটক, সব মিলিয়ে যেন পটে আঁকা একটা ছবি। এটি ওদের warm city, ঠাণ্ডার মাত্রা টা আমাদের দেশের মত ছিল, মানে রুম হিটার ছাড়া থাকা যায় আর কি। শীতকালে রাজা আর গুরুত্বপূর্ণ মংক রা এই শহরে চলে আসেন অন্যান্য জায়গা থেকে। ভুটানের প্রতিটা নদী ই সুন্দর, আমরা প্রতিটা শহরেই নদী দেখেছি, হা ভাল্যিতে, থিম্পুতে, পারো তে আর পুনাখা তে। তবে সুন্দরতম হচ্ছে পুনাখা ছু। শীতকাল বলে নদীতে পানি কম ছিল, ছোট বড় অসংখ্য পাথর, নীলাভ পানি, নদীর উপর লোহার ব্রিজ পার হয়ে আমরা একটা গ্রামে গিয়েছিলাম। পড়ন্ত বিকাল, অবশেষে সূর্যাস্ত দেখলাম। আবার সন্ধ্যার পর হাটতে হাটতে নদীর পাড়ে গেলাম। অদ্ভুত এক নির্জনতা। চাঁদনী রাতে মায়াবী নদীটার কুল কুলে শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল।

(চলবে…)

About Shakilah

Loves history, culture and traveling to new places!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *