হলুদ নদী, সবুজ সুন্দরবন – ট্রাভেল ডায়েরী

Posted In: Traveler's Blog, by on Sep, 18 2018. Leave a Reply

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হলুদ নদী, সবুজ বন নামের বইটা যদিও সুন্দরবনের কাছাকাছি থাকা মানুষের গল্প, কিন্তু এর চেয়ে সুন্দর করে মনে হয় এক কথায় সুন্দরবনকে বর্ণনা করা সম্ভব না। তাই যখন সুন্দরবন দেখার সুযোগ হল, বহু বছর পর এই লাইনটাই মাথায় আসল প্রথমে।

আমরা সুন্দরবন গিয়েছিলাম আগস্টের একদম শেষে। দুজনেরই প্রাইভেট চাকরি, তাই তিনদিন টানা সরকারি ছুটিই ভরসা । ইন্টারনেট ঘেঁটে ব্লু বার্ড ট্যুরের খোঁজ পেয়ে গেলাম। ওদের সাথে অভিজ্ঞতা সত্যি অসাধারন ছিল। খাবার থেকে শুরু করে আতিথিয়তা, সবই। আমরা খুব সকালে খুলনা পৌঁছে গেলাম। রয়্যাল মোরে নেমে নাস্তা করে ঝটপট চলে গেলাম কাস্টম ঘাটে। খুলনা শহরও আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা । আসলে পদ্মার এপারে ফরিদপুরের পর আমার কখনো আসা হয় নি। যে ব্যাপারটা চোখে পড়ার মত তা হল চারদিক অনেক বেশি সবুজ আর নদী ভাঙ্গনের চিহ্ন সব জায়গাতেই স্পষ্ট।

১ম দিন

কাস্টম ঘাটে গিয়ে চোখে পড়লো আমাদের ক্রুজ শিপ “ম্যানগ্রোভ”। ট্রলার দিয়ে নদী পার হয়ে শিপে উঠে গেলাম। এরপরের পুরো ৩ দিনই নদীতে ছিলাম আমরা। একেবারেই অন্যরকম অভিজ্ঞতা। রবীন্দ্রনাথের গল্পের মত মনে হচ্ছিল বজরায় নৌবিহারে বের হয়েছি। যদিও ১০০ বছরে নদী এবং প্রকৃতি অনেকটাই বদলে গেছে। তারপর ও, প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ হয়েছে এটাই সৌভাগ্য। আমাদের অলস দিনের অধিকাংশ সময় কেটেছে ছাদে খাওয়া দাওয়া করে আর আড্ডা দিয়ে। নদীর খোলা হাওয়া, কখনো ঝুম বৃষ্টি আবার কখনো ঝলমলে দিন, অনন্য সুন্দর সূর্যাস্ত, আড্ডা আর গানে মুখর ছিল আমাদের শিপ ।

view of Bangladeshi village from river cruise in Sundarban

আমাদের প্রথম দিনটার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত লেগেছে আমাদের সুন্দরবনে পৌছাতে। বনের আগের দৃশ্যও অনেক উপভোগ্য। কখন দুপাশে ছোট ছোট গ্রাম, লোক পারাপারের নৌকা, মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকা । আবার মংলার কাছাকাছি একেবারেই আলাদা দৃশ্য। বিশাল বিশাল সব কার্গো শিপ, ফ্যাক্টরি আর মানুষের কর্ম ব্যস্ততা। সব কাটিয়ে আমরা প্রথম যখন সুন্দরবন দেখলাম, সত্যি অন্য বনের সাথে পার্থক্যটা স্পষ্ট ছিল। এত ঘন জঙ্গল, বহু আগে থেকে কথাও জনমানব নেই, আর জোয়ারের পানিতে গাছগুলো কোমর পানিতে ডুবে আছে। নদী আর খাল এঁকে বেঁকে চলছে আর দুপাশে ঘন বন যেন ঝুঁকে আছে পানিতে।

আমরা প্রথম দিন হারবারিয়াতে নেমেছিলাম। মূলত বনের মাঝখানে কিছুকিছু জায়গায় বন বিভাগের অফিস আছে, সেই পয়েন্ট গুলোতে পর্যটকদের নামতে অনুমতি দেয়। হারবারিয়া এমনই একটা জায়গা। এখানে হাঁটার একটা ট্রেইল (লোহার ফ্রেমে কাঠের মাচা) আছে। আমরা বেশ কিছুদূর হেঁটেছি এখানে। দুপাশে পশুর, সুন্দরী, গোলপাতা আরও অনেক শ্বাসমূল ওয়ালা গাছ। বনবিভাগের অফিসের কাছেই বন্যপ্রাণীর জন্য পুকুর। যদিও এখানে আমরা হরিণের দেখা পাইনি, তবে হরিণের পায়ের ছাপ দেখেছি প্রচুর। আসলে এত মানুষের কোলাহলে বন্যপ্রাণীরা কাছে আসে না। শিপের লোকজন আর আমাদের গানম্যনরা ভরসা দিলেন যে আগামীকাল কটকাতে গিয়ে অবশ্যই হরিণ দেখতে পাবো।

২য় দিন

আমরা রাতে গিয়ে ভিড়লাম বড় সুন্দরী খালে। একদম ভোরে যখন শিপ চলতে শুরু করল তখন থেকেই দুপাশে কেওড়া গাছের ঘন বন আর ফাঁকে ফাঁকে হরিণের দেখা পেলাম। কটকাতে যখন আমরা পৌঁছাই তখন কেবল এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। বনবিভাগের অফিস আছে ওখানে একদম সমুদ্রের পাড়ে। এত বছর পর ও সিডরের চিহ্ন স্পষ্ট। কর্তব্যরত লোকেদের কাছে শুনলাম যে এখানে ৫০ জনেরও বেশি জেলেদের লাশ পাওয়া গিয়েছিল। সাথে মৃত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও ছিল ২ টা, অন্যান্য প্রানির মৃতদেহ তো ছিলই। এখনো অনেক গাছের ভাঙ্গা অংশ পড়ে আছে। নতুন করে ওখানটায় আর গাছ হয় নি। হয়তো মাটি তে কোন পরিবর্তন এসেছে।

তবে ওখানে কিন্তু আমরা হরিণের ঝাঁকের দেখা পেয়েছি। বাঘের উপস্থিতিও আছে, যদিও আমরা দেখতে পাইনি। চিত্রা হরিণ গুলো মায়াময় চোখ নিয়ে চেয়ে থাকে দূর থেকে। আমাদের গানম্যান কেওড়া গাছ থেকে পাতা পেড়ে দিয়েছিল, আর তখন ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণ চলে আসে। যদিও মানুষ থেকে দূরে ছিল, তবুও কেওড়া পাতার লোভ ওরা ছাড়তে পারে নি। আমাদের শিপের কেউ কেউ কেওড়া ফল নিয়ে এসেছিল। খেতে জলপাই আর তেতুলের মাঝামাঝি। বেশ মজার।

বীচে কিছু সময় কাটিয়ে আমরা শিপে ফিরে এলাম। এরপর গিয়েছি আমরা টাইগার পয়েন্টে। এই জায়গাটা কটকার দিকের চেয়ে আলাদা। ছোট খাল দিয়ে আমরা যখন পৌছালাম তখন একটা বানর পরিবার আমাদের স্বাগত জানালো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই জায়গাটার দুপাশে গভীর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, কিন্তু মাঝের জায়গা টা একদম আমাদের সাধারন বাংলাদেশ । অনেক ফুলের গাছ আছে এখানে। প্রায় ১ ঘণ্টা আমরা এই অসাধারন জায়গা দিয়ে হেঁটে বীচে পৌঁছাই। বেশ বড় একটা বীচ, অনেকটা কুয়াকাটার মত। মনেই হয় না যে বনের ভিতর এমন একটা সুন্দর সমুদ্রতট থাকতে পারে।

ফিরে এসে দুপুরের খাবারের পর আমরা কচিখালি যাই। দূর থেকে ডিমের চর দেখলাম, দেখতে সত্যি ডিমের মত দ্বীপটা। প্রবল ঢেউ পারি দিয়ে আমরা ছোট্ট ট্রলারে করে কচিখালি পৌঁছাই। এদিকে বাঘের অনুপস্থিতির জন্যই কিনা জানি না, হরিণ গুলো বেশ বড়সড় ছিল। নেমে আমরা হেঁটে জামতলি বীচে গেলাম। ওখানে বনবিভাগের অফিস আছে। পথের পাশে বনে বন্য শুকরের দেখাও পেলাম, আর মৌচাক তো ছিলই। ফেরার পথে ট্রলার থেকে দুপাশে প্রচণ্ড ঘন বন দেখলাম, মনে হল মানুষ ঢুকা সম্ভব না সেখানে। শ্বাস মূল গুলো ও অনেক বড়, হয়তো জোয়ারের পানি বেশি উঠে যায় ওখানে। বেশ ক্লান্তি আর একরাশ ভাল লাগা নিয়ে দিন শেষ করলাম।

Sea beach in Sundarban Khulna Bangladesh

৩য় দিন

পরদিন ফেরার পালা। আমরা দুপুরের আগেই করমজল পৌঁছে গেলাম। করমজলে মূলত একটা চিড়িয়াখানা আর কুমীরের প্রজনন কেন্দ্র আছে। হাঁটার ট্রেইলটা খুব সুন্দর। অনেক সুন্দরী, গোলপাতা আর হোগলাপাতা গাছ দেখলাম। ওয়াচ টাওয়ার থেকে খুব সুন্দর লাগে চারপাশটা । প্রচুর বানর আছে এখানে। ওদের থেকে সাবধান থাকাই ভাল। ফেরার পথে নদীতে শুশুক দেখেছি আমরা! বাঘের দেশে গিয়ে বাঘ দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনটাই হয়নি, তবে বন্য প্রাণী আর গহীন বন দেখতে পেরেছি। সুন্দরবনকে এবারের জন্য বিদায় জানিয়ে বিকেল চারটা নাগাদ আমরা খুলনা পৌঁছে গেলাম। বেশ খানিকটা সময় তখন পেয়ে গেলাম খুলনা শহর ঘুরবার জন্য। ফেরার পথে খুলনা শহর আর রূপসা সেতু দেখা হয়েছে, কিন্তু বাগেরহাটে না যেতে পারার দুঃখ টাও রয়ে গেছে মনে। ভাল লাগা আর নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা খুলনা ছেড়ে এলাম।

কিভাবে যাবেনঃ ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত বাস বা ট্রেনে। ওখান থেকে ঘাট একদমই কাছে। ঢাকা থেকে বা খুলনায় কথা বলে ট্যুর প্যাকেজ ঠিক করে নিতে পারেন। আমাদের এজেন্সির সার্ভিস অসাধারন ছিল।

খরচঃ প্যাকেজ বাবদ আমাদের দিতে হয়েছে ৬৫০০ টাকা জনপ্রতি। ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়া আসার খরচ আলাদা।

সুবিধা অসুবিধাঃ শিপে সব ব্যবস্থাই আছে, তবে বাথ্রুম শেয়ার করতে হয়। খাবার এবং সার্ভিস শিপের উপর নির্ভর করে। কথাও কোন দোকানপাট নেই, কিচ্ছু কেনার সুযোগ নাই। তাই প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে যাওয়া ভাল। হাঁটার উপযোগী জামা, জুতা নিলে আপনার ভ্রমণ উপভোগ্য হবে।

About Shakilah

Loves history, culture and traveling to new places!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *