শিলং ট্রাভেল ডায়েরি পর্ব ১ – মেঘালয়ের পথে

শিলং এর গল্প প্রথম শোনা একদম ছোট বেলায় আমার বাবার কাছে। তার শৈশব কেটেছে আসামে, তাই বইতে মেঘালয়ার রাজধানীর যে গল্প তিনি পরেছিলেন তা তার মনে গেঁথে ছিল। পাহাড়ি এই শহরটায় আমার যাবার ইচ্ছে হয় এই গল্পগুলো শুনেই। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যে যাওয়া এত সহজ, তা আমি জানতাম না। যখন শুনলাম যে তামাবিল ডাউকি বর্ডার দিয়ে এত কাছে শিলং, হুট হাট প্লান করে ভিসা করে ফেললাম। তিনদিন ছুটি আর দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি নিয়ে চললাম ২০১৭ এর ডিসেম্বরে।

১ম দিন

আমরা ঢাকা থেকে রাতে রউনা হয়ে তামাবিল বর্ডারে পৌঁছাই পরদিন সকাল ৯ টায়। একদমই ছোট্ট বর্ডার, টিনের ঘরের দুইটা অফিস আর নাস্তার ২ টা দোকান। আমরা নাস্তা করে ট্র্যাভেল ট্যাক্সের টাকা জমা দিয়ে বর্ডার পার হলাম, ওপারে অফিস আর কার্যক্রম, দুঃখজনক হলেও, গুছানো মনে হল। কেউ ঘুষও চায়নি যেটা বাংলাদেশ বর্ডারে হয়েছে।

Shillong town

আমরা মোটামুটি সকাল ১১ টার মধ্যে বর্ডারের কাজ শেষ করে ফেললাম। একটা গাড়ি নিয়ে নিলাম শিলং যাওয়ার জন্য। ড্রাইভার ভদ্রলোক খাসি (বাংলাদেশে আমরা যাদের খাসিয়া বলি) সম্প্রদায়ের লোক, বেশ আলাপী আর সাবধানী। সত্যি বলতে আমরা প্রত্যেকেই নতুন কোন জায়গায় গেলে একজন দুজন যাদের সাথে কথা হয় তাদের দেখেই জায়গাটার ব্যাপারে ধারনা করে ফেলি। তাই এই ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয়ে আমাদের বেশ ভাল একটা ইম্প্রেশন হয়েছিল শিলং এর ব্যাপারে। বর্ডার পার হলেই জায়গাটার নাম ডাউকি, আমরা জাফলং থেকে যে সেতুটা দেখি, ওই সেতুটা পার হয়েই শিলং যেতে হয়। জায়গাটা অসম্ভব ভাল লেগে গেলো প্রথম দেখাতেই। ঝরঝরে পরিস্কার স্বচ্ছ পানি, একদম তলা পর্যন্ত দেখা যায়। ওইদিন শিলং পৌঁছানোর তাড়া থাকায় ঠিক করলাম ফেরার পথে আসবো সময় নিয়ে। ডাউকি থেকে শুরু করে শিলং পর্যন্ত পুরোটাই আস্তে আস্তে উঁচু হতে থাকে, মানে uphill। আর পাহাড়ের কিনারা ঘেঁষে রাস্তা। একদমই আমাদের সীমান্তে, তাই বেশ দূর পর্যন্ত বাংলাদেশ দেখা যায়। ওই পাহাড় থেকে খুব সমতল আর সবুজ লাগে আমাদের দেশটাকে।

shillong dauki river

আমরা আড়াই ঘণ্টা পর শিলং পৌঁছে গেলাম। শহরটা অবশ্য একটু আশাহত করলো। অনেক ছোট শহর পাহাড়ের উপর, তবে অনেক ভিড়। কারন পুরো মেঘালয়ের অধিকাংশ মানুষের বসবাস এখানে। একটা মল আছে, পুলিশ বাজার নামে, শপিং এর সব কিছুই এর আশপাশে । আমরা বিকেলে ছোট্ট একটা কফি শপে বসেছিলাম, মজার ব্যপার লক্ষ্য করলাম তখন যে এখানে কম বয়সিরা মোটামুটি সবাই ইংরেজিতে কথা বলে। কদিন থেকে লোকজনের সাথে কথা বলে বুঝলাম যে এখানে লোকজনের মধ্যে এত বৈচিত্র যে নিজেদের ভাষায় কথা বলার সুযোগ খুব কম। আমরা রবিবারে যখন বেড়িয়েছিলাম তখন চোখে পড়লো মিজোদের গির্জা, যেখানে মিজো ভাষায় প্রার্থনা হয়, খাসিদের গির্জায় খাসি ভাষায়, আবার তাদের পোশাক আর চেহারাতেও বেশ ভিন্নতা আছে। অনেক জাতের আর অনেক ধাঁচের লোকের বাস এই শহরে।

আমরা প্রথম দিনই এক জন ড্রাইভার ঠিক করে নেই পরের ৩ দিনের জন্য, উনি নেপালি ছিলেন। বেশ ভাল সময় কেটেছে তার সাথে। আমাদের শিলং এর চেয়ে তার আশপাশের জায়গা গুলো অনেক বেশি ভাল লেগেছে। ডাউকি থেকে যখন আমরা শিলং যাই, দুপাশে কোথাও গ্রাম, ছোট ছোট বাজার, আবার কোথাও ফাঁকা জায়গা। বুঝলাম, কেন মেঘালয়কে প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড বলা হয়! আমরা যখন মেঘালয়ে আসি, আশা ছিল অনেক ঝর্না দেখব। কিন্তু আমরা ডিসেম্বরের যে সময়টাতে গিয়েছি তখন ঝর্নাগুলো একটু কম পানি থাকে, তবে মেঘালয়ের সৌন্দর্যকে শুধু ঝর্নাতে সীমাবদ্ধ করলে এই অসম্ভব সুন্দর জায়গাটার প্রতি সত্যি অবিচার হবে। এখানে ঝর্না, পাহাড়, কোথাও বিরানভূমি, পাহাড়ি গুহা, ছোট ছোট গ্রাম, বিভিন্ন রং আর ঢংয়ের মানুষ, সব মিলিয়ে একেবারেই অন্য এক অভিজ্ঞতা।

২য় দিন

আমরা প্রথম দিন শিলং শহরটাই ঘুরে দেখেছিলাম। পরদিন ভোরে নাস্তা করে রউনা হলাম চেরাপুঞ্জিতে । চেরাপুঞ্জির অন্য নাম সহরা, আসলে সহরাই ছিল সত্যিকারের নাম, কিন্তু ব্রিটিশরা এই সহরা কে উচ্চারণ করতে গিয়ে চেরা বানিয়ে ফেলে আর পরবর্তীতে লোক মুখে নাম হয়ে যায় চেরাপুঞ্জি। আমার খুব আগ্রহ হয়েছিল কেন ব্রিটিশরা এত আগ্রহী ছিল এই পাহাড়ি দুর্গম জায়গাটার প্রতি। জানতে পারলাম যে তারা বহু আগেই সন্ধান পেয়েছিল এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের কথা। প্রচুর চুনাপাথর ছাড়াও আরও অন্যান্য সম্পদ আছে এখানে।

Shillong

জানতাম যে ঝর্না দেখবো, কিন্তু চেরাপুঞ্জির ঝর্নার ধরণটা যে এত আলাদা হবে ধারনা ছিল না। পুরো পাহাড়টার এক কিনার ধরে কি বিশাল বিশাল ঝর্না! Grand Canyon fall, Seven sisters’ fall দেখে আফসোস হচ্ছিল যে কেন বর্ষায় আসলাম না! এত বিশাল, ঝর্নার নামটা সত্যি মানায় তাদের রুপের সাথে। তুলনামূলকভাবে Noakalikai falls টা একটু আলাদা। পানির মূলধারা একটাই । এটি ভারতের সরবচ্চ ঝর্না। এই ঝর্নার মিথটা শুনে খুব মায়া লেগেছিল। Noakalikai নামের একজন মহিলার নামে এই ঝর্না, প্রচলিত আছে তিনি এই ঝর্নায় ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। Grand Canyon fall, Seven sisters’ fall দেখে যেমন বিশালতায় মন হারিয়ে যায়, Noakalikai দেখতে ঠিক তেমনি মায়াবী লাগে।

ওইদিন আমরা এরপর Mawsmai Cave দেখতে যাই। গুহাটা বেশ বড়, কিছু কিছু জায়গা বেশ অপ্রশস্ত , তবে পাথরের প্রাকৃতিক গঠন দেখলে মনে হয় যেন কোন শিল্পীর অনেক যত্ন করে করা নকশা। বেশ মুগ্ধতা নিয়ে আমরা ফিরলাম ওখান থেকে।

আমরা দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম লোকাল একটা দোকানে। অনেকটা নেপালিদের মত থালি পরিবেশন করে ওরা। খেতে একদম ই আমাদের দেশি খাবার, তবে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে ওরা অনেক বেশি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন । আমরা রাস্তার পাশে থেকে কিউয়ি ফল খেয়েছিলাম, তা ও খুব সুন্দর করে পরিবেশন করেছিল। শিলং ফেরার পথে আমরা Elephant Falls দেখলাম। ৩ টা ধাপে অনেক বড় একটা ঝর্না, এত সুন্দর কিন্তু এর বিশালতার জন্য একটা ছবিতে পুরোটা তোলা সম্ভব না। জানলাম এটির লোকাল নাম ছিল ৩ ধাপের ঝর্না (খাসি ভাষায়), কিন্তু বড় ঝর্নার হাতির মত আকৃতির জন্য এটিকে ব্রিটিশরা নাম দিয়েছিল Elephant Falls। আমাদের অবশ্য তা দেখার সৌভাগ্য হয়নি, কারন অনেক আগেই ভুমিকম্পে হাতির মাথাটা ভেঙ্গে যায়। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা শিলং ফিরে যাই।

দ্বিতীয় পর্বে শিলং ট্রিপের পরবর্তী দিনগুলোর সাথে থাকছে, খরচ, সুবিধা অসুবিধা সহ অন্যান্য টিপস…

About Shakilah

Loves history, culture and traveling to new places!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *