কাঠগোলাপ আর সৈকতের দেশে (বালি, ইন্দোনেশিয়া) – পর্ব ২

(পর্ব ১ এর পর…) বালিতে ১ম দিন ই আমাদের একটা দোকানে উচক নামের একজন ট্রাভেল agent এর সাথে পরিচয় হয়, উনিই আমাদের বাকি ট্রিপ প্লান করতে সাহায্য করেছেন । আমরা ২ জন ওনার গাড়িতে করে ঘুরেছি দিন প্রতি ২৪০০ টাকা তে । বালিতে আমরা প্রথম দিনটা হোটেলের আশপাশে ঘুরেই কাটিয়েছি । কুতা বীচে আমরা গিয়েছিলাম, তবে এর সাথে কক্সবাজার বীচের খুব পার্থক্য নাই । অবশ্য ঢেউ গুলো আরো বড়, সার্ফারদের জন্য খুব ভালো ।

বালি তে মোটামুটি সবাই কালচারাল টুর অফার করে যার মাধ্যমে আপনি বালির সংস্কৃতির ব্যপারে ধারনা করতে পারেন। যেমন বারং ডান্স (ঐতিহ্যবাহী নাচ , অনেকটা মঞ্চনাটকের মত) , কাচাক ডান্স দেখি নাই, তাই বিস্তারিত জানি না) ,ফায়ার ডান্স, বাটিক, সিল্ভার, পেইন্টিং এর জায়গা গুল ঘোরা, কফি প্লানটাশন দেখা । কফি প্লানটশন এ কফি গাছ, বানানোর প্রক্রিয়া খুব সুন্দর করে দেখায়, ফ্রিতে টেস্ট করতেও দেয় । কফি প্লানটশন এ গেলে লওয়াক কফি খেতে পারেন। লওয়াক কফি টা সিভেট ( অনেটা বানরের মত) নামের একটা প্র্রানীর মল থেকে, মুলত এটা সুমাত্রার ( অন্য একটা দ্বীপ) ঐতিহ্য । এছাড়া বালি কফি ও খেতে পারেন , বালি কফি এই দ্বীপেই তৈরি।চিন্তা করুন, আমাদের ও কত কি আছে পর্যটকদের দেখানোর, অথচ পরিকল্পনার অভাবে কিছুই হয় না।

আমরা ২য় দিনেই বারং ডান্স দেখে স্কুবা ডাইভিং করতে চলে যাই নুসা দুয়ার তাঞ্জং বেনয়া তে। অসম্ভব সুন্দর একটা রাস্তা দিয়ে যেতে হয় ওখানটায় । পুরো ম্যানগ্রোভ বনের পাশ দিয়ে সমুদ্রের উপর দিয়ে রাস্তাটা। তারপর স্কুবা ডাইভিং। ভাই আগে ভাবতাম স্নরক্লিংয়ের থেকে স্কুবা সহজ, কারন এখানে অক্সিজেন থাকে। কিন্তু আসল চেলেঞ্জ টা হল মুখ নিশ্বাস নেয়া আর পানির নিচে শান্ত থাকা।

ওইদিনই আমরা দুপুরের খাবারের পর চলে গেলাম আয়ুং নদীতে রিভার রাফটিং করতে । বালি তে ২ টা নদীতে রাফটিং করা যায়, আয়ুং আর তেলেগা তে । যারা ১ম বার করছেন, আয়ুং টা তাদের জন্য ভাল । অসম্ভব ভাল লাগা নিয়ে শেষ করলাম জার্নি টা । আমাদের গাইড খুব হেল্পফুল থাকা সত্ত্বেও আমি ২ বার পড়ে যেতে নিসিলাম, তবে ব্যপার না! যেমন সুন্দর নদীটা , তার চেয়েও সুন্দর নদীর মাঝে মাঝে ঝর্না আর পাথরে খোদাই করে আঁকা ছবি আর দুপাশের বন ।

River rafting in bali indonesia

পরের দিন আমরা চললাম গিলি ট্রাওয়াণগান এ । তখন ও আমরা জানতাম না নীল সাগর যে সত্যি এত নীল ! হোটেল থেকে fast boat এর গাড়ি আমাদের তুলে নেয় ১০ টায় । এরপর পাডাঙ বাই তে অপেক্ষা , fast boat এ গিলি ট্রাওয়াণগান পৌছালাম বেলা ৩ টায়। গিলি মোট ৩ টা দ্বীপ গিলি মেনো ,ট্রাওয়াণগান আর আইর, যেন ৩ টুকরো স্বর্গ (বিশ্বাস করেন, বাড়িয়ে বলছি না)। গিলি ট্রাওয়াণগান এই সবচেয়ে বেশি পর্যটক । এই ৩ টা দ্বীপ ই লম্বকে । ওখানে গিয়ে প্রথমেই সেন্ট মারটিনের কথা মনে পড়লো। হোটেলগুল, আর দ্বীপের ভিতরটা অমন ই । দ্বীপে কোন গাড়ী চলে না, বাই সাইকেল আর ঘোড়ার গাড়ী চলে । আমরা একটা টেনডাম বাইক (২ জন চালানোর বাইক) সূর্যাস্ত দেখতে গেলাম দ্বীপের আরেক পাশে । কত ধরনের যে বীচ দ্বীপ টায়, পাথুরে, বালিময়, পাহাড়ি । একটু দূরেই লোম্বোক দ্বীপের পাহাড় দেখা যায় , আর আরেক পাশে গিলি মেনো । দ্বীপের চারদিকে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী থাকে । চাইলে ফিশিং, আইল্যান্ডে হপিং বা স্নরক্লিং করতে পারেন ।

৪থ দিনে আমরা স্নরক্লিং করলাম । সত্যি বলে বুঝাতে পারবো না কি সুন্দর! আমরা ২ জনের কেউ ই খুব ভাল সাঁতার জানি না, একটু ভয় লাগছিল, তবে এত সুন্দর প্রবাল, হলুদ , নীল, সবুজ আরও রং বেরঙের মাছ দেখে সব ভুলে গিয়েছিলাম । মাত্র ১ দিন গিলিতে কাটিয়ে আমরা বালিতে ফিরে এলাম । সময় আরও বেশি থাকলে অন্তত ২ টা দিন থাকা যেতো ।

৫ম দিন আমরা বালিতে ঘুরেছি BATUAN Temple ( পাথরে খোদাইয়ের জন্য বিখ্যাত), Goa Gajah (গূহা, ঝর্ণা আর এক ই সাথে হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দির ) আর Tanah lot ( সমুদ্রের পাড়ে এক ই সাথে অনেক গুলো মন্দির, খুব সুন্দর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায় এখানে) । দুপুরে আমরা mount Batur viewpoint এ একটা restaurant এ খেলাম উবুদ এ। উবুদ বালির পাহাড়ি অঞ্চল । এখানেও আমরা একটা কফি প্ল্যানটাশনে গিয়েছিলাম । বালির কফি প্ল্যানটাশনের আইডিয়াটা আমার খুব ভাল লেগেছে । একদম আলাদা আইডিয়া রেস্টুরেন্টের জন্য । mount Batur viewpoint এ এক ই জায়গা থেকে বাতুর লেক, মাউনট আগাং, বাতুর দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়ার অসংখ্য আগ্নেয়গিরির ২ টা এই দ্বীপে। কিন্তামানি ভলকেনো এদের ই একটি যা বাতুরের একদম মাথায়। প্রায় সম্পূর্ণ পর্বতটা আগ্নেয়গিরির ছাই এ ঢাকা আর ধুসর। এটা একদম ই নতুন অভিজ্ঞতা আমাদের। পর দিন এই পর্বতে উঠবো, এই খুশিতে ওখান থেকে চলে এলাম।

৬ ষষ্ঠ দিন ভোর ২.৩০ টায় কুতা থেকে রওনা হলাম Mount Batur এর দিকে। কোনো ধারণা ছিল না যে ওখানে এত ঠান্ডা হবে । ভাগ্যিস আমাদের গাইড জ্যাকেট রেডি করে রেখেছিল! আমরা ৪ টায় পর্বতের গোঁড়ায় পৌঁছলাম । হিসেব অনুযায়ী ২ ঘণ্টা লাগে উপরে যেতে । আমরা দুজন আর একজন আমেরিকান, এই ৩ জনের দলকে আমাদের লেডী গাইড ঠিক ২ ঘণ্টা পর উপরে পৌঁছলেন । সূর্যোদয় দেখলাম, সাথে আরও ৩ টা পর্বত, Mount Agung, Abang আর Rinjhani . প্রথম ২ টা পর্বত বালিতেই, আর ৩ য় টা লম্বকে ।Mount Agung আর Rinjhani তেও আগ্নেয়গিরি আছে আর সবগুলাই active ! আমরা ভাবছিলাম সূর্যোদয় দেখা টাই আসল সৌন্দর্য, গাইড এর কথায় ভুল ভাঙল , উনি আমাদের ভলকানর crater দেখাতে নিয়ে গেলেন , কয়েকটা জায়গা থেকে এখনো ধোঁয়া উঠছে, আর crater টা একদম বিশাল বড় একটা গর্ত । তখন আবারও মনে হল, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি কত অদ্ভুত হতে পারে, সত্যি মানুষ খুব ক্ষুদ্র । crater এর একপাশে গুহা আছে, তবে ভিতরে যাওয়া নিষেধ, একটা মন্দির ও আছে গুহার ভিতরে, তবে উতসবের দিন ওই ধর্মানুসারীরা যেতে পারেন । এই আগ্নেয়গিরি শেষ অগ্লুতপাত হয়েছে ২০০০ সালে , তবে অতটা বড় ছিল না, কিন্তু এর আগে একবার অগ্লুতপাত হয়ে সম্পূর্ণ গ্রাম ঢেকে গিয়েছিলো , এখন দেখা যায় ছাইয়ে ঢাকা এলাকাটি । নিচে নামতে গিয়ে টের পেলাম কি খাড়া পাহাড়টায় উঠেছি, ২ পাশে একদম ঢাল । নেমে আমরা Batur lake দেখলাম, নীল চমৎকার শান্ত একটা লেক, পাশেই সুন্দর গ্রাম, আশ্চর্য ব্যপার হল কোন পর্যটক চোখে পড়ে নি । ড্রাইভার বললেন লেকের পারের Trunyan জনগোষ্ঠীর কথা, তারা তাদের Tree cremation ঐতিহ্যের জন্য সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত , তবে পর্যটকরা দেখতে যেতে পারে না । ওইদিন ই বালিতে আমাদের শেষ দিন ছিল, তাই আর কোন দর্শনীয় স্থানে না গিয়ে কুতার আশপাশেই দর্শন করলাম স্কুটি চালিয়ে । Legian beach এ গেলাম, Discovery shopping mall ঘুরলাম, মলের পিছনেই আবার বীচ আছে, হেঁটে বেড়ানোর জন্য খুব ভাল জায়গা।

বালি তে দেখার আরও অনেক জায়গা ছিল , যেমন উলু ওয়াতু , উলুনদানু, গোয়া লাজাহ, আরও অনেক temple আছে। এছাড়া trekking এর জন্য Mount Agung আর Abang ও যাওয়া যেত সময় থাকলে। আর গিলি হয়ে লম্বকে গিয়ে তো আরও ২ দিন কাটাতে পারলে আরও অসাধারন একটা ট্রিপ হত । Lovina beach এ অনেকেই ডলফিন দেখতে যায় একদম ভোরে । আবার Waterbom পার্কে গিয়েও একদিন কাটিয়ে দিতে পারেন । তবে ৭ দিনের বেশী ছুটি পাওয়া চাকরিজীবীদের জন্য সত্যি কঠিন ।

এটাই আমাদের দেশ থেকে এত দূরে প্রথম ট্রিপ । বাংলাদেশের, ভারতীয় টুরিস্ট তেমন চোখে পড়ে নি, তবে অনেক Australian আর European ছিলেন । বলতে গেলে আমরা ছিলাম ওখানে অন্যরকম দেখতে মানুষ । অসাধারন এই স্মৃতিগুলো নিয়ে ৭ম দিনে রওনা হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে ওখানকার সময় ১২ টা । এসে পৌঁছলাম রাত ১১ টায় । সম্পূর্ণ ট্রিপ এ আমাদের খরচ হয়েছিল দুজন মিলে ১৫০,০০০ টাকা ( কোন কেনাকাটা ছাড়া)। এর মাঝে টিকেটে লেগেছে ৭৭,০০০ টাকা, তবে আমরা আরও আগে টিকেট করলে আরও কমে যেতে পারতাম । বালি যে খুব tourist friendly তার প্রমান হচ্ছে, এখানে চাইলে আপনি খুব relaxed, luxarious ট্রিপ করতে পারেন, আবার অনেক কেনাকাটা করতে পারেন, আবার চাইলে অনেক activity করতে পারেন, চাইলে খুব কম খরচে একটা backpack travel ও করতে পারেন।

About Shakilah

Loves history, culture and traveling to new places!

One response to “কাঠগোলাপ আর সৈকতের দেশে (বালি, ইন্দোনেশিয়া) – পর্ব ২”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *