কাঠগোলাপ আর সৈকতের দেশে (বালি, ইন্দোনেশিয়া) – পর্ব ১

অনেক দিন ধরেই আমি আর অনিন্দ্য এমন একটা ট্রিপের কথা ভাবছিলাম যেখানে কিছু এডভেঞ্চার বা এক্টিভিটি করতে পারব, যেটার কথা দুজন বেঁচে থাকলে ৩০ বছর মনে করে যেন প্রান খুলে হাসতে পারি । কর্পোরেট কামলা জীবনে চাইলেই সব করা যায় না । পয়সা জোগাড় হয়ে গিয়েছিল ৬ মাস আগে, কিন্তু দুইজনের ছুটি জোগাড় হয় নি । তাই দুইজন বেশ জেদ করেই ৭ দিন পরে একটা প্লান করে ফেললাম । প্রথমে ভাবছিলাম মালায়শিয়ার কথা । কুয়ালালামপুর হয়ে কোটা কিনাবালু যাব, সাগর, পাহাড় আর শহর দেখা হবে একসাথে । তখন ও জানতাম না যে বালি নামের একটা দ্বীপ এ এর সব ই কত সুন্দর করে গুছানো আছে । কিন্তু ট্রাভেল এজেন্ট বলল এত অল্প দিনে ভিসা হবে না মালায়শিয়ার । বালি তে ভিসা লাগে না, সাত পাঁচ ভেবে আমরা বালির ২ টা টিকেট করে ফেললাম ।

আমাদের যাত্রা শুরু করলাম মালিন্দতে ১১ মে রাত ১২ টা ৫০ এ । মালিন্দর অনেক বদনাম শুনেছি ফ্লাইট দেরি করা নিয়ে, কিন্তু আমাদের ফ্লাইট একদম ঠিক সময় ছাড়ল । কুয়ালালামপুর পৌঁছলাম লোকাল সময় ৬ টা ৪০ এ । ট্রানজিট শেষে আরেকটা ফ্লাইট শুরু হল ৯ টা ১৫ র তে আর বালি ডেনপাসার এ পৌঁছলাম দুপুর ১২ টা ১৫ তে।

জাস্ট ২ মিনিটের মধ্যে ভিসা হয়ে গেল । ডেনপাসার এয়ারপোর্ট টা খুব সুন্দর, অনেকটা খুব যত্ন নিয়ে সাজানো বিশাল একটা হোটেলের মত । এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি নিলাম ১৩০ হাজার রুপিয়া দিয়ে, অনেক কম খরচ হয় ভেতর থেকে না নিয়ে বাইরে থেকে নিলে । ইন্দোনেশিয়া গিয়ে সবাই প্রথমে ধাক্কা টা খায় কারেন্সি নিয়ে । পুরাই পাগল হবার দশা হয় হিসেব করতে । সহজ বুদ্ধি হচ্ছে শেষের ৩ টা শুন্য বাদ দিয়ে ৬ দিয়ে গুন করা । তার মানে হোটেলে যেতে আমাদের খরচ হয়েছিল ৭৮০ টাকা । ফেরার পথে এসেছি এর অর্ধেক দিয়ে নীল ট্যাক্সি (মিটারে চলে) তে । অবশ্য প্রথমবার গিয়ে এয়ারপোর্ট এর বাইরে নীল ট্যাক্সি খোজা টা কস্টকর । ইন্দোনেশিয়ার ব্যপারে আমার ধারনা ছিল এটা স্বল্প উন্নত একটা দেশ হবে, কিন্তু ট্যুরিস্ট স্পট দেখেই কিনা জানি না, বালির প্রতিটা রাস্তা খুব সুন্দর, রাস্তার পাশে অসংখ্য কাঠগোলাপ গাছ, মাটির ধরন আর আবহাওয়া অনেকটা বাংলাদেশের মত হওয়ায় গাছ গুলিও আমাদের দেশের মত । এত দুরের একটা দেশে মনে হচ্ছিল বাড়ির কাছাকাছি আছি । অবশ্য একটা ব্যাপার এ ওরা একেবারেই আলাদা, এজন্যই ওদের রাস্তায় কোথাও কোন ময়লা ছিল না আর এত্ত গাড়ি চলে অথচ কেউ ভুলেও হর্ন দেয় না ।

আমরা ৫ রাত বালিতে ছিলাম আর ১ রাত গিলি ট্রাওয়াণগান দ্বীপে । বালিতে ৫ দিন এ কুতা তে ছিলাম।বেশ জমজমাট ঐ দিকটা । কুতা তেই সবথেকে বেশি টুরিস্ট থাকে । ৮০০ / ৯০০ টাকা থেকে শুরু করে অনেক দামের হোটেল আছে এখানে । আমরা ২ রাত ছিলাম HOTEL OZZ এ । সুইমিং পুল, Massage parlor , restaurant সহ সুন্দর একটা হোটেলে আমরা ছিলাম ২৭০০ টাকা তে । গিলি থেকে ফিরে আমরা Hotel Karthi নামের আরেকটা হোটেলে ছিলাম ১৮০০ টাকা তে আগের হোটেলের পাশের রাস্তায় । এই রাস্তাটা আরো বেশি জমজমাট, বিভিন্ন খাবার দোকান, সুভিনিয়ার শপ, আরো অনেক কিছু । এদিকটাতে একটু দামি সবকিছুই ,তবে শহরের happening place বলে কথা ! Waterbom পার্ক, Discovery shopping mall টাও এদিকে।

ইন্দোনেশিয়ার খাবার আমাদের জন্য মানিয়ে নেয়াটা খুব সোজা । ওরাও আমাদের মত ভাত খায়, কিন্তু রুটি পরটা খুব একটা চিনে না । ওদের রান্না আমরা খুব মজা করেই খেয়েছি । তবে প্রথমে গিয়েই ভেবাচেকা খেলে nasi ( ভাত ) goreng (ভাজি ) mi (নুডুলস) goreng (ভাজি) safe option। “সাতে” ( বাদাম আর ঝোল দিয়ে রান্না করা )নামের খাবার টা খুব ভাল লেগেছে আমার । তবে সব খাবার ই মিষ্টি মিষ্টি , ঝাল খুব কম, মসলা গুল আলাদা । কলা দিয়ে ওরা অনেক dessert বানায়, খেয়ে দেখতে পারেন। যারা হালাল মিট না পেয়ে ট্রিপে গিয়ে ঝামেলায় পরেন , বালি বা পুরো ইন্দোনেশিয়া তাদের জন্য ঝামেলা মুক্ত একটা জায়গা । যেহেতু দ্বীপের দেশ, sea food পাওয়া যায় প্রচুর তবে মোটেই সস্তা না ।

বালি ইন্দোনেশিয়ার একটা প্রদেশ । ওই দেশে অসংখ্য ভাষা, সংস্কৃতিতে ওরা বিভক্ত । সবার সাথে কথা বলেই মনে হয়েছে তারা তাদের দেশ আর সংস্কৃতি নিয়ে খুব গর্বিত । ওখানে অধিকাংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী, কিন্তু বালিতে ৯০% মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মজার ব্যাপার হল তারা অনেকটাই সংস্কৃতিগত দিক থেকে এদিক কার হিন্দু ধর্মাবলম্বী থেকে আলাদা । মানুষরা খুব আলাপি, আর তারা জানে কিভাবে পর্যটকদের সাথে কিভাবে মিশতে হবে । এই ব্যাপার টা পর্যটকদের comfortable হতে খুব সাহায্য করে ।

আমারমত যারা অযথা উল্টা পাল্টা গহনা কিনতে পছন্দ করেন , বালি তাদের জন্য খুব ভালো জায়গা । এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী সারঙ ( লুঙ্গি) বা নজর কাড়া বাটিকের জামা কাপড় কিনতে পারেন । এছাড়া রুপার তৈরি গহনা কিনতে পারেন আর বড় শহরের মত নামকরা সব ব্র্যান্ড শপ তো আছেই । আরেকটা মজার ব্যপার হচ্ছে এখানে বেশ সস্তায় (আবার মাসটারপিস কিনতে চাইলে অনেক দামী) পেইন্টিং পাওয়া যায় ।

(পর্ব ২ পড়ুন…)

About Shakilah

Loves history, culture and traveling to new places!

One response to “কাঠগোলাপ আর সৈকতের দেশে (বালি, ইন্দোনেশিয়া) – পর্ব ১”

  1. […] (পর্ব ১ এর পর…) বালিতে ১ম দিন ই আমাদের একটা দোকানে উচক নামের একজন ট্রাভেল agent এর সাথে পরিচয় হয়, উনিই আমাদের বাকি ট্রিপ প্লান করতে সাহায্য করেছেন । আমরা ২ জন ওনার গাড়িতে করে ঘুরেছি বাংলাদেশী টাকা তে । বালিতে আমরা প্রথম দিনটা হোটেলের আশপাশে ঘুরেই কাটিয়েছি । কুতা বীচে আমরা গিয়েছিলাম, তবে এর সাথে কক্সবাজার বীচের খুব পার্থক্য নাই । অবশ্য ঢেউ গুলো আরো বড়, সার্ফারদের জন্য খুব ভালো । […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *